- bartasomoy24.com - https://bartasomoy24.com -

“এত্ত জুলুম সইবে না,আমার ঘরডা আর ভাইঙ্গেন না”

“এত্ত জুলুম সইবে না,আমার ঘরডা আর ভাইঙ্গেন না”

এইডা গরীব মাইনসের ঘর। ৫-৭ বছর ধইরা ঘর করছি। এত্ত জুলুম সইবে না। আল্লায় আছে, তিনি কী এ্যাসব চোখে দ্যোখে না? আমার ঘরডা আর ভাইঙ্গেন না। নিজের সখের ঘরটি রক্ষায় এভাবেই প্রশাসনের কাছে আকুতি করছিল সিরাজ হাওলাদার।
মাদারীপুরের শিবচরে শেখ হাসিনা হনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি অ্যান্ড হাইটেক পার্ক নির্মাণের নির্ধারিত জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে প্রশাসন। ২৮ শে জানুয়ারী ২০২১ইং বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে দিনব্যাপী এ অভিযান চালানো হয়। এ পর্যন্ত শতাধিক ঘরবাড়ি ও স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে প্রশাসন। ক্ষতিপূরণের টাকা না দিয়ে প্রশাসনের এই উচ্ছেদ অভিযানের ফলে সিরাজ হাওলাদারের মত অনেকেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেস হাইওয়ের পাশে আইসিটি মন্ত্রণালয় শিবচর উপজেলার কুতুবপুর ও কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের প্রায় ৭০ দশমিক ৩৪ একর জমি নিয়ে হাইটেক পার্ক নির্মাণের জমি অধিগ্রহণের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি আইসিটি মন্ত্রনালয় থেকে মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমি হুকুম দখলের প্রস্তাব করে। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ওই এলাকায় কিছু অবৈধ ঘরবাড়ি, বাগান, ও খামার স্থাপন করে এক শ্রেণির দালাল চক্র। এই পরিস্থিতিতে গত ১৮ জানুয়ারি ওই এলাকায় সম্ভাব্য ক্ষতিপ্রস্তদের নিয়ে সভার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। সভায় জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন এক সপ্তাহের মধ্যে সকল স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশনা দেয় সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের। পরে গত বুধবার থেকে কাঁঠালাবড়ি ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল বেপারী ও কুতুবপুর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুর মাতুব্বর নেতৃত্বে এই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিরাজ হোসেনের নেতৃত্বে একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট ও বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনীর সদস্য প্রকল্প এলাকায় অভিযান শুরু করে। এ পর্যন্ত শতাধিক ঘরবাড়ি ও স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে প্রশাসন।
এদিকে প্রকল্পটি নির্মাণের প্রস্তাবিত স্থানে ক্ষতিপূরণ ছাড়াই স্থাপনা ও গাছপালা উচ্ছেদের প্রতিকার চেয়ে বুধবার বিকেলে শিবচরের কুতুবপুর ইউনিয়নের বড় কেশবপুর এলাকায় মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্থরা। মানববন্ধনে প্রায় তিন শতাধিক ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ অংশ নেন। এ সময় তারা জানায়, প্রথমে ৪ ধারা নোটিশ দিয়ে জমি অধিগ্রহণ করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্থদের কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ ও নোটিশ না দিয়েই গত ১৮ জানুয়ারি এক সপ্তাহের মধ্যে স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যা সম্পূর্ণ অনিয়ম। প্রশাসন তাদের ক্ষমতা বলে ইচ্ছেখুশি মত কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের কথা প্রশাসন কিছুই শুনছে না।
এ সম্পর্কে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (এলও) প্রমথ রঞ্জন ঘটক বলেন, হাইটেক পার্ক এলাকায় ৪ ধারা নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সবাই নোটিশ পেয়ে যাবে। আইনে বলা আছে, ৪ ধারা নোটিশের আগে সব স্থাপনার ক্ষতিপূরণ পাবে ক্ষতিগ্রস্থরা। আবার আইনে বলা আছে, জেলা প্রশাসক যদি মনে করেন ক্ষতিপূরণের মাত্রাটা সন্তোষজনক নয় তাহলে তিনি ওই স্থাপনা উচ্ছেদ করতে পারেন।’
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে প্রকল্পটির নির্মাণের প্রস্তাবিত স্থানে গিয়ে দেখা যায়, মাটি কাটা যন্ত্র দিয়ে নতুন-পুরানো সব ধরণের স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। দুটি ইউনিয়নের কোথায় প্রশাসন আবার কোথায় ইউপি চেয়ারম্যানদের নেতৃত্বে হচ্ছে এ উচ্ছেদ অভিযান। গড়ে উচ্ছেদ চলায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থরা ক্ষতিপূরণ না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
কবির হাওলাদার নামে আরেক ক্ষতিগ্রস্থ বলেন, আমি ক্ষতিপূরণও পাইলাম নাই। নোটিশও পাইলাম নাই। হঠাৎ সিদ্ধান্ত দিয়ে ১০ দিনের মাথায় সব ভেঙ্গে দিয়ে চলে গেলো। গরীবের উপরেই সব অত্যাচার, কেউ দেখার নেই।’
স্থানীয় সাইদুর ব্যাপারী নামে একজন জানান, হাতে গোনা কিছু অসাধু লোক অতিরিক্ত বিল নিতে নতুন নতুন ঘর বাড়ি তুলেছে। যা দেখলেই বোঝা যায়। প্রশাসন থেকে যাচাই-বাছাই করে উচ্ছেদ চালানো উচিৎ ছিল। আমরা চাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থরা যাতে ক্ষতিপূরণ পায়।
এলাকার ষাটোর্ধ্ব কৃষক মো. শাহ্ আলম মৃধা বলেন, ‘আমাগো পাশের এলাকায় বাড়ি ছিল। পদ্মা সব ভাইঙ্গা লইয়া গেলে কুতুবপুরে জমি কিইনা দুই ভাই বাড়ি করছি। কিছু গাছ-গাছালি লাগাইছি। চেয়ারম্যানের লোকজন আইয়া হঠাৎ কইরা এগুলো ভাইঙ্গা নিতে কইছে। সাতকুলে আর তো থাকোনের জায়গা নাই। বাড়িঘর ভাইঙ্গা নিলে আমরা কোথায় ঠুঁই লমু? দুই মাইয়া, বৌ লইয়া পথেপথে থাকোন ছাড়া আর কোন উপায় নাই।’
এ সম্পর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘হাইটেক পার্ক নির্মাণের নির্ধারিত জায়গায় দালালচক্র সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাটের জন্য অসংখ্য স্থাপনা ও বাগান করেছে। আমরা এ স্থাপনাগুলো সরিয়ে নিতে সাতদিন সময় বেধে দিয়েছিলাম। ১০ দিনের মাথায় এসে অবৈধ স্থাপনাগুলো অপসারণ শুরু করেছি।’
জানতে চাইলে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন বলেন, ‘৪ ধারা নোটিশ প্রদান করার আগেই ওই এলাকার মানুষ জেনে যায় এখানে হাইটেক পার্ক নির্মাণ হবে। তাই তারা ইচ্ছেমত স্থাপনা নির্মাণ করে। পরে আমরা দেখলাম কিছু নতুন ঘর ও স্থাপনা একদমই নতুন। আমরা অবৈধ স্থানপা উচ্ছেদে কাজ শুরু করেছি। তবে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থরা ক্ষতিপূরণ পাবেন। এ বিষয় আমাদের নজর আছে।’